নেত্রী যাকে বেশি ভালোবাসছেন সে কিন্তু টিকে নাই : শোভন

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেছেন, ‘ইতিহাসে নেত্রী শেখ হাসিনা যাকে বেশি ভালোবাসছেন সে কিন্তু টিকে নাই, তাকে বা তাদেরকে বিভিন্ন ব্লেইম দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে নেত্রীর কাছ থেকে। আমরাও কিন্তু ষড়যন্ত্রের শিকার।’ ছাত্রলীগের সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে এ কথা বলেছেন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন।

গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার ও সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের যৌথ সভায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শোভন ও রাব্বানীর কর্মকাণ্ডে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি শোভন-রাব্বানীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথাও বলেন। সেই রাতে শোভন-রাব্বানী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ চাইলেও পারেননি।

এর পর পরই শোভন ও রাব্বানীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ডানাপালা মেলতে থাকে। পরে শোভন ও রাব্বানী দুদিন গণবভনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েও ফিরে আসেন। গণভবনে তাঁদের প্রবেশের স্থায়ী পাস বাতিল করা হয়। এর পরই আলোচনায় আসে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ।

ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই নিজের অবস্থান তুলে ধরে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। চিঠিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) গোলাম রাব্বানী তাঁর বিরুদ্ধে আসা নানা অভিযোগ খণ্ডনের পাশাপাশি নিজেদের ভুলগুলো ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য বলেছেন। একইসঙ্গে ‘আস্থার প্রতিদান দেওয়ার জন্য’ পুনরায় সুযোগও চেয়েছেন।

চিঠিতে যা বলা আছে :

‘আমরা বিশেষ মহলের চক্ষুশূল’

গোলাম রাব্বানী চিঠির শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীকে ‘মমতাময়ী নেত্রী’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই চতুর্মুখী চাপ, সদ্য সাবেকদের অসহযোগিতা, নানা ষড়যন্ত্র, প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা আর আমাদের জ্ঞাত-অজ্ঞাত কিছু ভুল ইতিবাচক পরিবর্তনের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করেছে।’

নিজেদের ‘দায়িত্বশীল আচরণের ব্যর্থতা ও কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির’ কথা স্বীকার করেছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তবে এটাও বলেছেন, তাঁরা ‘একটি বিশেষ মহলের চক্ষুশূল’।

‘আপনার সন্তানরা এতটা খারাপ না’ প্রধানমন্ত্রীকে একথা লিখে গোলাম রাব্বানী আরো বলেছেন, প্রতিপক্ষ ‘বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে ও প্রপাগাণ্ডা ছড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সুকৌশলে আপনার এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের কান ভারী করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।’

‘ঘুম থেকে দেরিতে ওঠার বিষয়টিও অতিরঞ্জিত’

২০ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনের দেরি প্রসঙ্গ এনে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘১৮ জুলাই আপনি দেশের বাইরে যাবার আগে অনুমতি নিয়ে ১৯ তারিখ আম্মুর (সাধারণ সম্পাদক) প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমি এবং সভাপতি মাদারীপুর গিয়েছিলাম। ওই দিন সারারাত নির্ঘুম জার্নি আর বেশ কয়েকটি পথসভা (সর্বশেষ সকাল ৮টায় সাভারে) করে সকাল ৯টায় ঢাকা ফিরি।’

‘রেস্ট নিয়ে পূর্বনির্ধারিত ১২টার সম্মেলনে পৌঁছাতে আমাদের ৪০ মিনিট দেরি হয়, যা অনিচ্ছাকৃত এবং অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগেই অবগত। সকালে ঘুম থেকে দেরিতে ওঠার বিষয়টিও অতিরঞ্জিত। গত ১ বছরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সব কর্মসূচিতে (সকাল ৭টা-৯টা পর্যন্ত) আমরা উপস্থিত থেকেছি এবং যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছি। ডাকসুর জিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মধুর ক্যান্টিনে কম উপস্থিতি নিয়ে যে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, তা অতিরঞ্জিত।’

‘জাবি ছাত্রলীগকে এক কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হয়’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ এনে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদকের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অভিযোগ আপনার কাছে ভিন্নভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। উপাচার্য ম্যামের স্বামী ও ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে কাজের ডিলিংস করে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য করেছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ঈদুল আজহার আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে এক কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হয়।’

‘এ খবর জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরু হয় এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য ম্যাম আমাদের স্মরণ করেন। আমরা দেখা করে আমাদের অজ্ঞাতসারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে টাকা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলায় তিনি বিব্রতবোধ করেন। নেত্রী, ওই পরিস্থিতিতে আমরা কিছু কথা বলি, যা সমীচীন হয়নি। এজন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।’

এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের নতুন ভবনে ছাত্রলীগের কার্যালয় প্রসঙ্গে চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘অফিস অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা করা নিয়ে যে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দায়িত্বপ্রাপ্ত শাহজাহান ভাই চায় না ছাত্রলীগ এখানে থাকুক। লোক দিয়ে বাইরে থেকে ময়লা ফেলে, বাথরুম ও দেয়াল অপরিচ্ছন্ন করে সেগুলোর ছবি তুলে আপনাকে দেখানো হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মিন্টু ভাই, লোকমান ভাই এবং ক্লিনার জাবেদ ভাইয়ের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই প্রকৃত সত্য জানতে পারবেন।’

এ সব বিষয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, ‘একটা সাধারণ মানুষও বুঝে যে কারো যদি নেশা করতে ইচ্ছা করে, অনেক জায়গা আছে, পার্টি অফিসে কেন নেশা করবে? আমরা যখন যাই আমাদের সাথে নেতাকর্মীর বেষ্টনী দেওয়া থাকে, আমরা কি একাকি থাকতে পারি? আমাদের চারপাশে অনেক লোক থাকে। আর মদের যে বিষয়টা আসছে, মদ খেতে তো একটা পরিবেশ লাগে ভাই। মদ খেয়ে কেউ কোনো দিন সুস্থ থাকতে পারে? মাতলামি করবেই। পার্টি অফিস কি এ রকম জায়গা? নতুন পার্টি অফিসে একমাত্র আমরাই শুধু জায়গা পেয়েছি, আর কোনো সংগঠন কিন্তু পায়নি।

যুবলীগ, এমন কি আওয়ামী লীগের কোনো লোক কিন্তু ওই খানে বসে নাই। বসছে শুধু ছাত্রলীগই। এ বিষয়টা নিয়ে অন্যান্যা যে অঙ্গ সংগঠনগুলো আছে সেগুলোতে একটু …ছাত্রলীগকে দিল আমাদেরকে দিল না। আরেকটি বিষয় হলো পার্টি অফিস যখন কারো আন্ডারে না থাকে, বন্ধ থাকে। তখন কিন্তু ঢাকার শহরে এ রকম একটা জায়গায় এমন একটা বিল্ডিংয়ে অনেক কিছু ঘটে আমরা শুনেছি। পার্টি অফিসের ভেতরে গুলিস্তানের যারা ব্যবসায়ী আছে, তারা বিভিন্ন রকম কর্মকাণ্ড করে আর কি, আড্ডা দেয়। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের যেন পার্টি অফিসটা না দেওয়া হয়, বন্ধ করে দেওয়া হয় এ জন্য অনেকে গেইম খেলছে।’

শোভন আরো বলেন, ‘আমাদের একটা বিশাল অংশ আছে, তারা চায় না আমরা সফল হই, সব সময় আমাদের বিতর্কিত করতে চেষ্টায় আছে সেটা বর্তমান মিডিয়া দেখলেই বুঝতে পারবেন। মিডিয়াতে ছাত্রলীগ ছাড়া কোনো কথা নাই। এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।’

ছাত্রলীগ সভাপতি বলেন, ‘ইতিহাসে নেত্রী শেখ হাসিনা যাকে বেশি ভালোবাসছে সে কিন্তু টিকে নাই, তাকে বা তাদেরকে বিভিন্ন ব্লেইম দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে নেত্রীর কাছ থেকে। আমরাও কিন্তু ষড়যন্ত্রের শিকার।’ সূত্র : এনটিভি অনলাইন