উন্মুক্ত ভিসায় ইন্দোনেশিয়া পরে ঝুঁকিপথে মালয়েশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার অন অ্যারাইভাল ভিসাকে (উন্মুক্ত) কাজে লাগিয়ে এখন নতুন পথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের যজ্ঞ চলছে। বাংলাদেশের কিছু দালাল, এজেন্সি ও অসাধু ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে আঁতাত করে অন অ্যারাইভাল ভিসায় শত শত বাংলাদেশি কর্মী প্রথমে ইন্দোনেশিয়া যায়। সেখান থেকে সমুদ্রপথে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমায় মালয়েশিয়ায়। আর মালয়েশিয়ায় পাচারের বিনিময়ে জনপ্রতি হাতিয়ে নেওয়া হয় আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা। মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অস্থিরতা চলছে। বেশির ভাগ দেশেই বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানো এখন বন্ধ।

সৌদি আরব, ওমান, কাতারে গিয়েও ভালো কাজ পাচ্ছে না প্রবাসীরা, অভিবাসনের টাকা ওঠাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। আর সাত মাস ধরে জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে সরকারিভাবে কর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদিনই বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার শ্রমিক বিদেশে পাড়ি দিতে ধরনা দিচ্ছে দালাল আর রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে। এমন পরিস্থিতিতে সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু দালাল আর সিন্ডিকেট। বিশেষ করে মালয়েশিয়া পাঠানোর নাম করে ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠছে তারা। আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার চুক্তিতে ইন্দোনেশিয়া হয়ে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এরই মধ্যে অনেকেই মালয়েশিয়া পৌঁছাতে পারলেও কেউ কেউ মালয়েশিয়া কারাগারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছে।

মালয়েশিয়ার একাধিক প্রবাসী এবং বাংলাদেশ কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে ইন্দোনেশিয়া হয়ে মালয়েশিয়ায় ঢুকতে গিয়ে শতাধিক বাংলাদেশি এখন দেশটির কারাগারে আছে। তারা দালালদের ফাঁদে পা দিয়ে এখন কারাগারে ধুঁকছে। কিন্তু মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কোনো কর্মকর্তাই এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বৈধ পথে শ্রমিক আসা বন্ধ থাকায় দালালরা নানা প্রলোভনে তাদের ইন্দোনেশিয়া হয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠাচ্ছে। কিন্তু যারা অবৈধ পথে আসছে, তাদের বেশির ভাগই মালয়েশিয়া পুলিশের হাতে আটক হয়ে জেলে যাচ্ছে। এটাতে বাংলাদেশের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, এমন হলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বৈধ পথে শ্রমিক পাঠানো জটিল হয়ে পড়বে।’ প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা বলছেন, মালয়েশিয়ার পাশের দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ‘অন অ্যারাইভাল’ ভিসা চালু থাকায় যে কেউ পাসপোর্ট হলেই যেতে পারে। ভ্রমণপিপাসু বাংলাদেশিরা ভিসা ছাড়াই ইন্দোনেশিয়ায় ভ্রমণ করতে পারছে। আর সেই ‘অন অ্যারাইভাল’ ভিসাকে পুঁজি করেই দালালচক্রটি মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের নিরাপদ পথ হিসেবে ব্যবহার করছে। ঢাকা থেকে সরাসরি বিমানে জাকার্তায় নেমে ইন্দোনেশিয়ার সোরাবাইয়া, বালি, বাতাম ও মেদান দ্বীপ হয়ে নৌপথে চলে যাচ্ছে মালয়েশিয়ায়। মানবপাচারের বিষয়টি নজরে আসায় মালয়েশিয়া সীমান্তে মেরিন ফোর্স বাড়ানোর পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় পুলিশ প্রশাসনও কড়াকড়ি অবস্থান নেওয়ায় প্রায়ই ধরা পড়ছে বাংলাদেশিসহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

অন অ্যারাইভাল ভিসায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া গেছেন এমনই এক প্রবাসী রফিকুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের নরসিংদীর রায়পুরা নীলক্ষ্যা ইউনিয়নের আব্দুল করিমের ছেলে। চার মাস আগে নরসিংদীর দালাল মো. হানিফের মাধ্যমে তিন লাখ টাকার চুক্তিতে মালয়েশিয়া যান। দালাল অনেক সহজভাবে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার কথা বললেও তিনি অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় যান। কয়েক দিন না খেয়েও থাকতে হয়েছিল তাঁর। অবৈধ পথে মালয়েশিয়া না যাওয়ার দাবি জানিয়ে রফিকুল বলেন, ‘তিন লাখ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়া না আসার চেয়ে দেশে চায়ের দোকান দেওয়া অনেক ভালো।

দালালদের কথায় ইন্দোনেশিয়া হয়ে মালয়েশিয়া আসার পথে মরার অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পৌঁছাতে পারলেও খুবই কষ্টে আছি মালয়েশিয়ায়। এখানে যে টাকা বেতন পাই, চেষ্টা করলে বাংলাদেশে এর চেয়ে বেশি উপার্জন করতে পারতাম।’ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে একই দলে ছিলেন মির্জারচর ইউনিয়নের সেলিম মিয়া। সাড়ে তিন লাখ টাকা দালালকে দিয়ে মালয়েশিয়া গেলেও খুব কষ্টে আছেন তিনি। সেলিম মিয়া বলেন, ‘আমাদের সঙ্গেও বেশ কয়েকজন পরিস্থিতি খারাপ দেখে ইন্দোনেশিয়া থেকেই দেশে ফেরত গেছে, কয়েকজন মালয়েশিয়া ঢোকার সময় আটক হয়েছে পুলিশের হাতে।’ বাংলাদেশ সরকার কঠোর হলে এই দালালরা এ রকম প্রতারণা করতে পারত না বলে দাবি করেন সেলিম।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া হয়ে মালয়েশিয়া যারা যাচ্ছে, তারা মানবপাচারের শিকার হচ্ছে। এই মানবপাচার রোধে সরকারের বিশেষ কিছু দায়িত্ব আছে; কিন্তু সেটা কঠোরভাবে পালন করছে না সরকারের দায়িত্বশীলরা। ইমিগ্রেশন পুলিশ কঠোর হলে অবশ্যই অবৈধ পথে মানবপাচার বন্ধ হবে বলে আমি মনে করি।’

অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করছেন ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক। তিনি বলেন, ‘বৈধ পথে মালয়েশিয়া যেতে না পেরে মানুষ এখন অবৈধ পথে ইন্দোনেশিয়া হয়ে মালয়েশিয়া যাচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি দ্রুত খোলা দরকার। সরকারের উচিত কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো।’ উৎস: কালের কণ্ঠ।