বোর্ডের বইয়ে সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও চরিত্রহনন!


আজ এক সপ্তাহ যাবত বিষয়টি নিয়ে আমি পেরেশান। ভেতর থেকে প্রচণ্ড অস্থিরতা আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। নিরুপায় হয়ে, আল্লাহর ওপর ভরসা করে মাগরিব পড়ে পোস্ট লিখতে বসলাম। মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে ছোট্ট একটি ভূমিকা বলছি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ তেইশ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে, কুরআনের আলোকনির্দেশনা অনুসারে যে মুবারক জামাত তৈরি করেছেন, তাঁরাই হলেন সাহাবায়ে কেরাম রাদি.। তাঁরাই আমাদের জন্যে ইসলামচর্চার অনুপম আদর্শ। আল্লাহ

সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআন কারিমে, সূরা বাকারায় আমাদের নির্দেশ করেছেন, ‘আমরা যেন সাহাবায়ে কেরামের ঈমানের মতো ঈমান আনয়ন করি।’ [সূরা বাকারা : ১৩]

কাজেই পরবর্তী উম্মাহ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, আমরা জীবনের পদে পদে তাঁদের ভালো বিষয়গুলো অনুসরণ করব। তাঁদের কারো জীবনে কখনো যদি মানবিক দুর্বলতার প্রকাশ ঘটে থাকে তাহলে সে বিষয়ে আমরা শতভাগ নিশ্চুপ থাকব। কোনো সাহাবির ছিদ্রাণ্বেষণ করার অধিকার আমাদের নেই। এটাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর চিরন্তন বিশ্বাস।

কারণ, মহান আল্লাহ কুরআন কারিমে তাঁদের সবার ওপর চিরকালীন সন্তুষ্টির কথা সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। [সূরা বাইয়্যিনাহ : ৮]

রাসূলুল্লাহ সা. একাধিক হাদিসে সাহাবায়ে কেরামের দোষচর্চার ব্যাপারে তীব্র সতর্ক করেছেন। খলিফা উমর ইবনুল আযিয রহ. তাঁর জীবনে শুধু এক ব্যক্তিকেই বেত্রাঘাত করে পিটিয়েছেন। লোকটির অপরাধ, সে হযরত মুআবিয়া রাদি.এর সমালোচনা করেছিল।

ইসলামের বুনিয়াদ নষ্ট করার ষড়যন্ত্র থেকে যুগে যুগে ইসলামের ধূর্ত

শত্রুরা সাহাবায়ে কেরামের চরিত্রহনন করার অপচেষ্টা সবসময় চালিয়ে এসেছে। উসমান রাদি. এর যুগে আত্মপ্রকাশকারী সাবাঈ চক্র সর্বপ্রথম সাহাবাবিদ্বেষের মিশন শুরু করে। তারা এক্ষেত্রে দু’জন সাহাবিকে টার্গেট করে। একজন খলিফাতুল মুসলিমিন উসমান রাদি.। দ্বিতীয় জন হযরত আমিরে মুআবিয়া রাদি.।

পরবর্তীকালে সমর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বিপর্যস্ত পশ্চিমা পরাজিত গোষ্ঠী প্রতিশোধের কাপুরোষচিত ভাবনা থেকে ওরিয়েন্টালিস্ট গবেষকদেরকে সাহাবাবিদ্বেষের মিশনে লেলিয়ে দেয়। প্রাচীন ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সাবাঈ ও শিয়া বর্ণনাগুলোকে উপজীব্য বানিয়ে তারা ভয়াবহ হামলা শুরু করে।

ওরিয়েন্টালিস্টদের বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা কার্যক্রমে মুগ্ধ হয়ে কিছু ইসলামি গবেষক এতোটাই পরাজিত মানসিকতার শিকার হয়ে পড়ে যে, তাদের কাছে ওরিয়েন্টালিস্টদের উপস্থাপিত প্রতিটি তথ্য মনে হয় সাক্ষাৎ অহি। তারা বুঝে-না বুঝে সেই তথ্য নিজেরাও যেমন গিলতে শুরু করে, তেমনই সাধারণ মুসলিমদেরকেও গেলাতে শুরু করে। যার জ্বলন্ত উদাহরণ উসতায আবুল আলা মওদুদি। দুঃখের বিষয় হলো, ভারতের নদওয়াতুল উলামার বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাওলানা সালমান নদভি সাহেবও এ পথের পথিক। এ দু’জনের বই-পত্রই তাদের সেই প্রাচ্যবাদ প্রভাবিত মানসিকতার দলিল।

ক্ষোভ, আতঙ্ক ও কষ্টের বিষয় হলো, আমাদের দেশের তৃতীয় বৃহত্তর শিক্ষাধারা আলিয়া মাদরাসার পাঠ্যপুস্তকেও সেই সাবাঈ ও ওরিয়েন্টালিস্ট চক্রের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আমি আজ শুধু দাখেল জামাতের ইসলামের ইতিহাস বই থেকে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরছি।

এ বইয়ে বিখ্যাত সাহাবি হযরত মুআবিয়া রাদি. ও হযরত আমর ইবনুল আস রাদি. এর চরিত্রহনন করা হয়েছে খুবই নির্মম শব্দে। এক জায়গায় উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রাদি. এর বিষোদগারও করা হয়েছে।

এ বইয়ে হযরত মুআবিয়া রাদি.কে ‘স্বার্থন্বেষী’ ‘সম্পদলোভী’ ‘ক্ষমতালোভী’ ‘উচ্চাভিলাষী’ ‘স্বার্থপর’ ‘ঔদ্ধত’ ‘জঙ্গি মনোভাবাপন্ন’ ‘চক্রান্তকারী’ ‘পরিস্থিতি ঘোলাটেকারী’ ‘অপরাজনীতিবিদ’ ‘ভোজবাজ’ ও ‘নিকৃষ্টতম শঠ’ বলা হয়েছে। ঠিক এই বিশেষণগুলোই তাঁর সম্পর্কে এ বইয়ে প্রয়োগ করা হয়েছে। দেখুন, বইয়ের ১৪৯, ১৫১, ১৫২, ১৫৩ ও ১৫৪ পৃষ্ঠা। শুধু তাই নয়, যেখানে অন্য সাহাবির নামের পর ‘রাদি.’ দুআ এসেছে, সেখানে সতর্কতার সঙ্গে মুআবিয়া রাদি. এর নামের পর ‘রাদি.’ ব্যবহার করা হয়নি।

এর পাশাপাশি আলোচিত পৃষ্ঠাগুলোর নানা স্থানে হযরত আমর ইবনুল আস রাদি.কে ‘ছলচাতুরিকারী’ ‘চক্রান্তকারী’ ‘ধূর্ত’ ‘হঠকারী’ ‘বিশ্বাসঘাতক’ ও ‘কপট’ বলা হয়েছে। যখনই তাঁর নাম এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে বিশেষণ হিসেবে ‘ধূর্ত’ শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে, নির্মমভাবে। তাঁর নামের সঙ্গেও ‘রাদি.’ দুআ বর্জন করা হয়েছে।

এমনকি এ বইয়ে জঙ্গে জামালের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, হযরত আয়েশা রাদি. হযরত আলি রাদি. এর প্রতি পূর্বশত্রুতা ও পূর্ববিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব থেকে এই যুদ্ধ বাধিয়েছেন। দেখুন, পৃষ্ঠা নম্বর ১৪৯।

আমি সবগুলো পৃষ্ঠা, লাইনে দাগ সহকারে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। সাথে সাথে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)এর ওয়েবসাইট থেকে বইয়ের পিডিএফ লিংক কমেন্টে দিয়ে দিচ্ছি।

আমি আশা করছি, উলামায়ে কেরাম বিষয়টির ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন হবেন এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিষয়টির ভয়াবহতা তুলে ধরবেন।

আমি সময়ের অভাবে পুরো বই পড়ার সুযোগ পাইনি। আলিয়ার সিলেবাসের অন্যান্য বইগুলো পড়ার সুযোগও হয়ে ওঠেনি। একটি বইয়ের পাঁচ-ছয়টি পাতায় যদি এমন বিষাক্ত আলোচনা থেকে থাকে তাহলে পুরো সিলেবাসের যত্রতত্র আরো ভয়াবহ ঈমানবিধ্বংসী আলোচনা থাকা অসম্ভব নয়।

আমি মনে করি, আহলে সৃুন্নাহ ওয়াল জামাআহর অনুসারী হিসেবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিষয়টি সম্পর্কে প্রতিবাদ-প্রতিকার করা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টির অসঙ্গতি তুলে ধরে অনতিবিলম্বে পাঠ্যপুস্তক সংশোধন করা আমাদের সবার ঈমানি দায়িত্ব।

আবদুল্লাহ আল ফারুক ।

সূত্রঃ ইসলাম টাইমস