৫৭ আসনে বিএনপিকে হারানো কঠিন

৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত ৫৭টি আসন আছে, যেখানে ১৯৯১ সালের পর থেকে প্রায় সব নির্বাচনেই জিতে এসেছেন বিএনপির প্রার্থীরা।

অবশ্য এসব আসনের মধ্যে ২০০৮ সালে বেশ কিছু তারা হারিয়ে ফেলে আওয়ামী লীগের কাছে। ঢাকা এবং আশপাশের কয়েকটি জেলা, বগুড়া, জয়পুরহাট, রাজশাহীতে প্রথমবারের মতো হার দেখতে হয় দলটিকে। এবার আসনগুলো পুনরুদ্ধারের আশায় দলটি।

আগামী ৩০ ডিসেম্বরের ভোটকে সামনে রেখে এবার ২৫৯ আসনে বিএনপি নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে। বাকিগুলো ছেড়ে দিয়েছে শরিকদের জন্য।

সর্বশেষ ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সারা দেশে যে ২৯টি আসন পেয়েছিল, সেগুলোকে দলের দুর্গই বলা যেতে পারে। তবে ওই নির্বাচনে তারা এমন আরও কিছু আসনে হেরেছিল, যেগুলোতে তিক্ত অভিজ্ঞতা এর আগে কখনো হয়নি। যেমন ঢাকা-১, ২, ১৯ ও ২০; মুন্সিগঞ্জ-১, ২ ও ৩; নরসিংদী-১, ২ ও ৩; মানিকগঞ্জ-১, ২ ও ৩; বগুড়া-২ ও ৫; জয়পুরহাট-১ এবং রাজশাহী-১, ২, ৪ ও ৫ ইত্যাদি। গত নির্বাচনের হিসাব বাদ দিলে ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রতিবার জয় পেয়েছে দলটি।

যেসব আসনে ভালো অবস্থানে বিএনপির প্রার্থীরা

পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী নওশাদ জমির। এই আসনে ১৯৯১ সালে মির্জা গোলাম হাফিজ এবং পরের দুটি নির্বাচনে জেতেন নওশাদের বাবা জমির উদ্দিন সরকার। ২০০৮ সালে অবশ্য তিনি বেশ বড় ব্যবধানে হেরে যান। তবে বিএনপি সেটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখছে। আশা করছে আসনটি পুনরুদ্ধারের।

রাজশাহী বিভাগ

বগুড়া-১ আসনে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের আবদুল মান্নানের কাছে হার ছাড়া বাকি সব নির্বাচনে বিএনপি এখানে জয় দেখে এসেছে। দলটি এবার সেখানে ধানের শীষ তুলে দিয়েছে কাজী রফিকুল ইসলামকে। তিনি ২০০৮ সালের সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের মোকাবেলা করবেন।

বগুড়া-৩ আসনে বিএনপির মাসুদা মোমিন তালুকদার লড়বেন জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম তালুকদারের সঙ্গে। ২০০৮ সালে সারা দেশে বিপর্যয়ের মধ্যেও এই আসনটি ধরে রাখতে সক্ষম হয় বিএনপি।

বগুড়া-৪ আসনেও ধানের শীষ মানেই জয় দেখে এসেছেন ভোটাররা। দলটি এবার প্রার্থী করেছে মোশাররফ হোসেনকে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী মহাজোটের প্রার্থী জাসদের এ কে এম রেজাউল করিম তানসেন।

বগুড়া-৫ আসনে বিএনপির জি এম সিরাজের বিপরীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবিবুর রহমান। ২০০৮ সাল ছাড়া এই আসনে বিএনপিকে কখনো হারতে হয়নি।

বগুড়া-৬ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে নির্বাচন করে আসছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। প্রতিবার জিতেছেন বিপুল ব্যবধানে। প্রতিবারই বেড়েছে ভোটের ব্যবধান। এবার খালেদা জিয়া ভোটে দাঁড়াতে পারছেন না বলে বিএনপি ধানের শীষ দিয়েছে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইমলাম আলমগীরকে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী মহাজোটের নুরুল ইসলাম ওমর (জাতীয় পার্টি)।

বগুড়া-৭ আসনে বিএনপির জনপ্রিয়তা আরও বেশি। সর্বশেষ ২০০৮ সালে এই আসনে খালেদা জিয়া জেতেন এক লাখ ৪০ হাজার ভোটের ব্যবধানে। এই আসনে এবার ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন মোরশেদ মিল্টন।

১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত রাজশাহী-১ আসনে টানা জয় পেয়েছে বিএনপি। তবে নবম সংসদ নির্বাচনে হেরে যান আমিনুল হক। তাকেই আবার প্রার্থী করেছে দল।

রাজশাহী-২ আসনও বিএনপি প্রথমবার হাতছাড়া করেছে ২০০৮ সালে। আসনটি পুনরুদ্ধারে এবার দলটি মার্কা দিয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনুকে।

রাজশাহী-৫ আসনেও একই পরিস্থিতি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা জয় পাওয়া বিএনপি হারে কেবল ২০০৮ সালে। আসনটি পুনরুদ্ধারে দলটি আস্থা রেখেছে সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফার ওপর।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী শাজাহান মিয়া। তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে জেতেন। তবে হেরে যান ২০০৮ সালে। আবার তার হাতেই প্রতীক দিয়েছে দল।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনেও ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত জিতেছে বিএনপি। তবে ২০০৮ সালে হেরে যান দলের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম। তার হাতেই ধানের শীষ উঠেছে।

নওগাঁ-৩ আসনটিও বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা জিতেছেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার আখতার আহমেদ সিদ্দিকী। তার ছেলে পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকীর হাতে দেওয়া হয়েছে ধানের শীষ।

নওগাঁ-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী আলমগীর কবির ১৯৯১ সাল থেকে ভোটে লড়ে হেরেছেন কেবল ২০০৮ সালে। এবার তিনি আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চান।

খুলনা বিভাগ

খুলনা-২ আসনে বিএনপিকে ২০০৮ সালের বিপর্যয়ের মধ্যেও হারতে হয়নি। আর ওই নির্বাচনে জয়ী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকেই প্রার্থী করেছে দল।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে টানা তিনবার জয়ের পর বিএনপি প্রথমবারের মতো হারে ২০০৮ সালে। আসনটি পুনরুদ্ধারে এবার মার্কা দিয়েছে শরিফুজ্জামানকে।

চুয়াডাঙ্গা-২ আসনেও একই চিত্র। বিএনপি টানা তিনটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে জেতার পর অল্প ভোটে হারে ২০০৮ সালে। এখানে ধানের শীষ পেয়েছেন মাহমুদ হাসান খান বাবু।

ঝিনাইদহ-২ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে বিএনপি প্রথম পরাজয় দেখে ২০০৮ সালে। আবদুল মজিদকে আসনটি পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব দিয়েছে বিএনপি।

ঝিনাইদহ-৪ আসনেও বিএনপি প্রথমবার হারের স্বাদ পায় ২০০৮ সালে। আসনটি নিজেদের দখলে ফেরাতে এবার লড়বেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ।

কুষ্টিয়া-১, ২, ৩ ও ৪ আসনও প্রথমবারের মতো বিএনপির হাতছাড়া হয় ২০০৮ সালে। চারটি আসনই তারা পুনরুদ্ধারের আশায়।

কুষ্টিয়া-১ আসনে রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা, কুষ্টিয়া-৩ আসনে জাকির হোসেন সরকার এবং কুষ্টিয়া-৪ আসনে ধানের শীষ পেয়েছেন সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী। অন্য আসনটি জোটের শরিক জাতীয় পার্টিকে (কাজী জাফর) দিয়েছে দলটি।

বরিশাল বিভাগ

২০০৮ সালে হেরে যাওয়া বরিশাল-৩ আসনটি দখলে এবার সেখানে লড়বেন জয়নুল আবেদীন। এর আগে তিনটি নির্বাচনেই সেখানে জয় পায় বিএনপি।

বরিশাল-৫ আসনে লড়বেন বিএনপির প্রার্থী মজিবুর রহমান সরোয়ার। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনেই হারেনি দলটি। নবম সংসদ নির্বাচনে বিপর্যয়ের মধ্যেও আসনটি দখলে রাখে দলটি।

ঝালকাঠি-১ আসনটি শাহজাহান ওমর নিজের করে নেন ২০০১ সাল পর্যন্ত। তবে হেরে যান ২০০৮ সালে। তার ওপরই আস্থা রেখেছে দল।

ঢাকা বিভাগ

ঢাকা-১ আসনে ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত টানা জয়ের ধারাবাহিকতার ইতি ঘটে ২০০৮ সালে। সেখানে ধানের শীষে লড়বেন আবু আশফাক।

ঢাকা-২ আসনেও একই পরিস্থিতি। ২০০৮ সালে হেরে যাওয়া আসনটি পুনরুদ্ধারে বিএনপি মার্কা দিয়েছে ইরফান ইবনে আমানকে।

ঢাকা-১৯ আসনেও বিএনপি প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পায় ২০০৮ সালে। ওই নির্বাচনে হেরে যাওয়া দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বাবুকেই মার্কা দিয়েছে দল।

ঢাকা-২০ আসনও ১৯৯১ সাল থেকে বিএনপি প্রথমবারের মতো হাতছাড়া করে ২০০৮ সালে। আওয়ামী লীগের দখল থেকে আসনটি পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব পেয়েছেন তমিজউদ্দিন।

মুন্সিগঞ্জ-১, মুন্সিগঞ্জ-২ ও মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনও ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত দখল করে রেখেছিলেন ধানের শীষের প্রার্থীরা। ২০০৮ সালে দখল হারানো তিনটি আসনে এবার প্রার্থী হয়েছেন যথাক্রমে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মিজানুর রহমান সিনহা এবং আবদুল হাই।

মানিকগঞ্জের তিনটি আসনের চিত্রও মুন্সিগঞ্জের মতো। এবার মানিকগঞ্জ-১ আসনে এস এ জিন্নাহ কবির, মানিকগঞ্জ-২ আসনে মাইনুল ইসলাম খান শান্ত এবং মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খান রিতাকে প্রতীক দিয়েছে বিএনপি।

নরসিংদী-১, ২ ও ৩ আসনে বিএনপি প্রথম হারের দেখা পায় ২০০৮ সালে। আওয়ামী লীগের দখল থেকে আসন তিনটি উদ্ধারের দায়িত্ব পেয়েছেন যথাক্রমে খায়রুল কবির খোকন, আবদুল মঈন খান ও মঞ্জুর ই এলাহী।

চট্টগ্রাম বিভাগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন বিএনপি অথবা তার জোটের দখলের বাইরে যায় কেবল ২০০৮ সালে। অবশ্য ২০০১ ও ২০০৮ সালে জোটের শরিককে আসনটি ছেড়ে দিয়েছিল দলটি। নিজেদের করে নিতে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সাত্তার ভুঁইয়ার ওপরই ভরসা রেখেছে দল।

কুমিল্লা-১ ও ৮ আসনে বিএনপি প্রথম পরাজয় দেখে ২০০৮ সালে। কুমিল্লা-২ ও ৩ আসনে হারেনি ওই বছরেও। এবার কুমিল্লা-১ ও ২ আসনে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, কুমিল্লা-৩ আসনে মুজিবুল হক এবং কুমিল্লা-৮ আসনে জাকারিয়া তাহের সুমনকে করা হয়েছে প্রার্থী।

নোয়াখালী-১, ২ ও ৩ আসন ২০০৮ সালের বিপর্যয়েও হাতছাড়া হয়নি বিএনপির। এবার তিনটি আসনে ধানের শীষে লড়ছেন তিন সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকন, জয়নুল আবদিন ফারুক এবং বরকত উল্লাহ বুলু।

নোয়াখালী-৪ আসন ২০০৮ সালেই প্রথম হাতছাড়া হয় বিএনপির। আসনটি পুনরুদ্ধারে বিএনপি আস্থা রেখেছে সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহানের ওপর।

লক্ষ্মীপুর-১, লক্ষ্মীপুর-২, লক্ষ্মীপুর-৩ আসন ২০০৮ সালেও ধরে রাখে বিএনপি। ১৯৯১ সালের পর থেকে অংশগ্রহণমূলক কোনো নির্বাচনেই এসব আসনে হার দেখেনি দলটি।

এবার চারটি আসনের মধ্যে লক্ষ্মীপুর-১ আসন জোটের শরিককে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। লক্ষ্মীপুর-২ আসনে ধানের শীষ পেয়েছেন আবুল খায়ের ভুঁইয়া এবং লক্ষ্মীপুর-৩ আসন পেয়েছেন শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী।

ফেনী-১ এবং ফেনী-৩ আসনে ২০০৮ সালের বিপর্যয়েও বড় ব্যবধানে জিতেছে বিএনপি। এবার আসন দুটির প্রার্থী যথাক্রমে রফিকুল আলম মজনু ও আকবর হোসেন।

চট্টগ্রাম-১১ আসনে (আগের চট্টগ্রাম-১০) ২০০৮ সালে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী হেরে যাওয়ার আগে দলের অন্য কারও এই অভিজ্ঞতা হয়নি। এবারও আমীর খসরুই লড়বেন ধানের শীষ নিয়ে।

চট্টগ্রাম-১৬ আসনে বিএনপি ২০০৮ সালে এসে পরাজয় দেখে। এর আগের তিনটি নির্বাচনেই পায় জয়। ১০ বছর আগে হেরে যাওয়া জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ওপরই আস্থা রেখেছে দল।

কক্সবাজার-১ আসন বিএনপি ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা জেতে। সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমেদের হাতে প্রতীক তুলে দিয়েছে বিএনপি।