সৌদির অবরোধ কাতারে যেভাবে এনে দিল কৃষি বিপ্লব!

টমেটো প্লান্ট পর্যবেক্ষণ করছেন এগ্রিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির আল-খালাফ – ছবি : মিডলইস্ট আই
রাজধানী দোহার ৫০ কিলোমিটার উত্তরে আল খর শহর। এর চার পাশে ধূ ধূ মরুভূমি। মরুভূমির নিরবতা ভেঙে সেখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি উট।



৫০ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যাওয়া তাপমাত্রা সেখানকার জমিটিকে করে তুলেছে শুষ্ক, যেন বলে দিচ্ছে এখানে আসতে মানা।

এমন ভূমিটিতেও অস্তিত্ব দেখা যায় বেশকিছু কাঁচের ঘরের। চকচক করতে থাকা এসব ঘর যেন কাতারিদের দ্রুত বেড়ে উঠা কৃষি ব্যবসারই প্রতীক। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অবরোধের পর এসব ঘরই কাতারের কৃষি বিপ্লবের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

‘এসব গ্রীনহাউসের ধাতব পদার্থগুলো তাপের কারণে গলে যায়’, বলছিলেন কৃষি ফার্ম এগ্রিকোর জেনারেল ম্যানেজার নাসির আল খালাফ। এ সময় তার মাথায় ছিল ঐতিহ্যবাহী গুত্রা পাগড়ি।

কাতারের মরু আবহাওয়ার মধ্যেই খালাফের পরিবার এগ্রিকোর কৃষি ব্যবসা শুরু করেছিলেন ২০১২ সালে। ১৯৫০ সালে গড়ে উঠা কোম্পানিটি এতোদিন শুধু খাদ্য আমদানি করতো।

বছরের পর বছরের প্রচেষ্টায় ফার্মটি এখন হয়ে উঠেছে কাতারের কৃষি ব্যবসার সবচেয়ে বড় স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান। খালাফ বলছিলেন, ফার্মটি এখন প্রতিদিন প্রায় পাঁচ টন শাক-সবজি উৎপাদন করে থাকে। আর এগুলো সম্পূর্ণ কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই করা হয়।

‘শুধু ইউরোপের দর্শনার্থীরাই এটি দেখে আশ্চর্যান্বিত হন না, খোদ কাতারের লোকজনও সহজে বিশ্বাস করতে পারেন না যে, এখানে সবকিছু উৎপাদন সম্ভব’, হেসে বলছিলেন খালাফ।

কাটিং-এজ প্রযুক্তি
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০১৭ সালের ৫ জুন আকাশ, সাগর ও সড়ক পথে কাতারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিছু বিদ্রোহী গ্রুপকে সমর্থন দেয়ার অভিযোগে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এসব গ্রুপের মধ্যে অবশ্য ইরানের সহায়তা পাওয়া কিছু গোষ্ঠীও রয়েছে। আর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্ত হয় মিসর, বাহরাইনসহ তাদের মিত্ররা।

কাতার অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করে।

আল খালাফ বলছিলেন, নিষেধাজ্ঞা জারির পর থেকে এগ্রিকো তাদের উৎপাদন দ্বিগুণ বাড়িয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এ উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে বছরের পর বছর ধরে কাটিং-এজ প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞতার কারণে। আর এ প্রযুক্তি তাদের পরিবেশের জন্যও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এসব গ্রিনহাউসগুলোকে সামান্য কিছু উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

হাইড্রোফোনিক চাষাবাদ ব্যবস্থায় মাটির পরিবর্তে গাছের চারার গোড়ায় পুষ্টি সরবরাহ করা হয়। কাচের কাঠামোর মাধ্যমে আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং সূর্যালোক নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

খালাফ বলেন, কৃষি খাতে ‘মেইড ইন কাতার’ বক্তব্যটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমরা এ প্রযুক্তি কাতারের অন্য ফার্মগুলোর কাছেও বিক্রি করছি।

নিষেধাজ্ঞার আগে ও পরে
সৌদি জোটের নিষেধাজ্ঞার ১৬ মাস পর কাতার তাদের আমদানি রুট ও কৃষি খাতের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়। নিষেধাজ্ঞার আগ পর্যন্ত কাতার তাদের প্রয়োজনের ৮০ শতাংশ খাদ্যদ্রব্যাদি প্রতিবেশী আরব দেশগুলো বিশেষত সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে আমদানি করত।

কাতারের পৌর ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কৃষি ও মৎস্যবিষয়ক সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি ফালেহ বিন নাসের আল-থানি বলছিলেন, আমদানি করা পণ্যের দাম এতো কম ছিল যে, কাতারের ফার্মগুলো তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারছিল না।

২০১৭ সালে একমাত্র স্থল সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন সামুদ্রিক ও আকাশ পথে বাণিজ্য রুট চালু করেছে কাতার। বিশেষ করে ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে তারা এসব রুটে পণ্য আনা-নেয়া করছে।

স্থানীয় পরিস্থিতির উল্লেখ করে থানি বলেন, অবরোধ আরোপের আগে স্থানীয় উৎপাদন শুধু ১৫ শতাংশ শাক-সবজির চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হতো। কাতারে চালু থাকা ১৪০০ ফার্মের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই অবাণিজ্যিক এবং কিছু পরিবার তাদের নিজস্ব চাহিদা পূরণে এসব ফার্মে উৎপাদন করে যাচ্ছে।

নিজের স্থাপিত মৌচাক দেখভাল করছেন খালিদ সাইফ আল সুওয়াইদি

মৌ চাষ
দোহার ঐতিহ্যবাহী বাজার সৌক ওয়াকিফের একটি সরু গলিতে মিডলইস্ট আই প্রতিবেদকের কথা হয় কাতারের শীর্ষস্থানীয় মধু উৎপাদনকারী আবু সাইফ অ্যাপিয়ারিজ ক্যাফের মালিক খালিদ সাইফ আল সুওয়াইদির সাথে। দেশ জুড়ে তিনি এক হাজারেরও বেশি মৌচাক স্থাপন করেছেন।

তার ক্যাফে ও দোকানে বিশেষভাবে উৎপাদন হয় কেক ও পানীয়, যাদের সব মধু দিয়ে তৈরি।

‘ঐতিহ্যগতভাবে মধু একটি পছন্দসই উপহার। এটাকে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে দেয়া হয়’, বলছিলেন সুওয়াইদি।

ছোটবেলা থেকেই মৌমাছির প্রতি আসক্ত বর্তমানে ৪৩ বছর বয়সী সুওয়াইদি জানান, তার বাবা চাইতেন না তিনি মৌমাচি পালক হন। তিনি চাইতেন ছেলে যেন সরকারি চাকরি করুক বা আরো ভালো কোনো পেশায় ক্যারিয়ার গড়ুক। কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তেই অটল ছিলেন।

‘ভাগ্যক্রমে আমি তার কথা শুনিনি।’

২০১০ সাল থেকে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে আবু সাইফ অ্যাপিয়ারিস। গত বছর এর উৎপাদন ছিল ১০ টন মধু।

নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে উৎপাদনের এ মাত্রা যথেষ্ট থাকলেও পরবর্তীতে আর সে অবস্থা থাকেনি। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে বেশ ক’মাস কোম্পানিটি ‘মেইড ইন কাতার’ মধু উৎপাদন করে। সুওয়াইদির ভাষায়, এটা করা হয়েছে জাতীয়তাবাদী মনোভাব ও কাতারি পণ্যের স্থানীয় চাহিদার কারণে।

তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকেই কাতারের তৈরি মধু চায়’।

স্থানীয় একটি চেইন সুপারমার্কেটের ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিষেধাজ্ঞার আগে সেখানে ইয়েমেনি সিডর মধুর চাহিদা ছিল বেশি। এ মধুটি আমদানি করা হতো সৌদি আরবের মাধ্যমে।

এ বছর ব্যাপক চাহিদার সংস্থান দিতে সুওয়াইদি কাতারের বন্ধুরাষ্ট্র ওমানেও অনেকগুলো মৌচাক স্থাপন করেছেন। উপসাগরীয় দেশগুলো অবরোধ আরোপ করলে ওমান দোহার পাশে এসে দাঁড়ায়।

নিজস্ব তৈরি আবু সাইফ মধু কাতারের বেশিরভাগ বাজার দখল করলেও ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন এখনো যথেষ্ট নয়।

সুওয়াইদি এখন মধু উৎপাদনে তার এ উদ্যমের ব্যাপারে অন্যদের উৎসাহিত করছেন। তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন অন্যদেরকে নিজস্ব মৌচাক স্থাপন শিখাতে। অবশ্য এজন্য তিনি কিছু ফি-ও নিচ্ছেন। এসব মৌচাক স্থাপন করা হচ্ছে বাড়ির বাইরে। আর এসব দেখভাল করছে আবু সাইফ অ্যাপিয়ারিস। তিনি বলছিলেন, মানুষজন এখন বাড়িতে তৈরি মধু পছন্দ করছেন।

জাতীয় গর্ব
অবরোধ আরোপের প্রথম দিনগুলোতে ‘মেইড ইন কাতার’ পণ্য ক্রয়ের এই আবেগতাড়িত ঢেউ ভোক্তাদের নতুন এক স্থানে নিয়ে গেছে।

প্যারিসভিত্তিক কাতারি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ল’অবসারভেইর ডু কাতার’-এর পরিচালক নাবিল আল নাসরি মিডলইস্ট আইকে বলেন, ‘মেইড ইন কাতার’ ব্র্যান্ডটি একটি আবেশে পরিণত হয়েছে। কারণ দেশটি এখন আর কারো রক্তচক্ষু দেখতে চায় না। অবরোধের কারণে কাতারের কৃষির উত্থান এখন জাতীয় গর্বের বিষয়।

কাতারের শীর্ষস্থানীয় চেইন সুপারমার্কেট আল-মিরার ম্যানেজার বলছিলেন, ‘অবরোধের আগে ও পরের’ একটি বিষয় রয়েছে। অনেকে এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা ‘মেইড ইন কাতার’ লেখার স্টিকারযুক্ত পণ্য খুঁজছেন। এর কারণ স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা হতে সাহায্য করা।

ওই ম্যানেজারের মতে, অবরোধ আরোপের আগে স্টিকার নিয়ে এতো মাতামাতি ছিল না। কিন্তু এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এসব পণ্য দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সুপারমার্কেটগুলোর সামনের সারিতে রাখা হচ্ছে।

হেন্ডারসনের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডলইস্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী প্রফেসর ক্রিস্টিয়ান হেন্ডারসন যিনি জিসিসি অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদন নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি বলছিলেন, কাতারের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী চাচ্ছে জাতীয়তাবাদের এ আবেগকে কাজে লাগাতে। ‘মেইড ইন কাতার’ কৃষিখাতে উন্নতি এর সবচেয়ে বড় উপায়।

অন্যদিকে, কাতার চেম্বার অব কমার্সের ২০০৯ সাল থেকে প্রতিবছর আয়োজন করা ‘মেইড ইন কাতার’ প্রদর্শনীটি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিভিত্তিক খাদ্য খাতের প্রসারে একটি প্লাটফর্ম হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এ বছরের প্রদর্শনীটি হবে আগামী নভেম্বরে ওমানের রাজধানী মাসকাটে।

স্থানীয় পণ্যের দাম
কিন্তু স্থানীয় পণ্যের দাম একটু বেশি, কারণ এর উৎপাদন খরচ বেশি। মিডলইস্ট আইকে দেয়া দেশটির নগর ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক হিসাব মতে, শহরের দোকানগুলোতে ২০১৬ সালের ‍তুলনায় ২০১৭ সালে ৬০ শতাংশ বেশি মূল্যে প্রতিকেজি টমেটো বিক্রি করতে হয়েছে। আর এ ধরনের মূল্য বৃদ্ধি নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে প্রভাব পড়েছে।

আল থানির মতে, আগামী বছরগুলোতে কাতার শাকসবজির বিষয়ে অন্যের উপর আরো বেশি অনির্ভর হয়ে উঠবে। ‘আগামী তিন বছরের মধ্যে কাতার আশা করছে শাকসবজির চাহিদার ৬০ শতাংশ যোগান দিতে পারবে’, বলেন তিনি। কিন্তু হেন্ডারসন যুক্তি দেখান যে, কাতারের জনগণের আমদানি করা পণ্যের প্রতি একটা আগ্রহ রয়েছে। এটা ছাড়া চলবে না।

প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা
পরিবেশগত বিষয়গুলো কাতারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনাগুলোকে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে। শুষ্ক মরু আবহাওয়া এবং পানির অভাবের কারণে কাতারের মাত্র ছয় শতাংশ জমি চাষযোগ্য।

জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, বিভিন্ন কারণে কৃষিখাতে অগ্রগতি হচ্ছে না। বিশেষ করে পানির উৎসের অভাব, পানির নিম্ন মান, অনুপাদনশীল মাটি, কর্কশ জলবায়ু পরিস্থিতি এবং দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনা।

আল থানি কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়নে পানির অভাব ও লবণাক্ত পানির সমস্যা সমাধানে কাটিং-এজ প্রযুক্তির ব্যবহারের গুরুত্ব উপলব্ধি করছেন।

‘সত্তরের দশক থেকে ভূগর্ভস্থ পানির গুনাগুন নষ্ট হয়ে গেছে। এটা এখন আরো বেশি লবণাক্ত হয়ে উঠেছে’, বলছিলেন তিনি।

থানির মতে, কাতারের কৃষকদের ৯৩ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি তুলে চাষাবাদ করে থাকে।

পানির অভাব দূরীকরণে এগ্রিকো একটি গভীর সেচ ব্যবস্থা ব্যবহার করেন, যা ভূগর্ভস্থ পানি ধীরে ধীরে সরাসরি মাটিতে পৌঁছে দেয়। আর এতে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পানি কম লাগে। আল খালাফের মতে, এ প্রযুক্তি প্রতিবছর হাজার হাজার কিউবিক মিটার পানি সেভ করে।

অবরোধের কারণে অর্থনীতি কঠিন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তারপরও কাতার নিজস্ব স্বাধীন সত্তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। সুওয়াইদির মতে, এ অবরোধ একটা বড় ‘সুযোগ’।

ইরান ও মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের হামাসসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা এবং সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থন দেয়ার অভিযোগে গত ৫ জুন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসর একযোগে কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করে। তবে কাতার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তথ্যসূত্র : মিডলইস্ট আই