অবশেষে সিআইডির জালে ধরা পড়ল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ডরের সেই ‘ভৌতিক গবেষক’

প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০১৮ / ০৯:৪১পূর্বাহ্ণ
অবশেষে সিআইডির জালে ধরা পড়ল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ডরের সেই ‘ভৌতিক গবেষক’

জনপ্রিয় রেডিও অনুষ্ঠান ‘ডর’-এর ‘ভৌতিক গবেষক’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া রাদবি রেজা ওরফে ‘টেরট বাবা’কে (৩২) গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা।

ভিডিওটি দেখুন এখানে

বৃহস্পতিবার রাতে রাদবিকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে টেরট কার্ড, ১টি জিপিএস জ্যামার, ২২টি কথিত মুক্তা, ২৮টি ধুপ, কথিত ইস্তাম্বুলের আতর ২টি, পড়া পানির বোতল ১টি, ৩টি মোবাইল ফোনসেট, ২টি সিপিসহ লাইভের জন্য ব্যবহৃত ১টি ক্যামেরা জব্দ করা হয়।
আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি জানানো হয়। গ্রেফতারকৃত এম. এম. জাহাঙ্গীর রেজা (রাদবি রেজা) (৩০) রাজধানীর ইন্দিরা রোডস্থ পূর্ব রাজাবাজারে। তার বাবা শামীম রেজা।

সিয়াইডির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এম. এম. জাহাঙ্গীর রেজা ওরফে রাদবি রেজা ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের দিকে এবিসি রেডিওতে কথিত প্যারানরমাল রিসার্চার হিসাবে যুক্ত হন। এর পূর্বে উক্ত অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র ভৌতিক গল্প শোনানো হত। কিন্তু রাদবি রেজা যুক্ত হবার পর শুরু হয় মানুষের নানাবিধ সমস্যার সমাধান পর্ব- টেরট কার্ড সেগমেন্ট। সাধারণ মানুষকে ফোন করে ও পরিচয় দিয়ে সেখানে অংশগ্রহণ করতে হতো তাই তারা সহজেই মানুষের কাছ থেকে তাদের ফোন নাম্বার পেয়ে যেত। সংগ্রহিত নাম ও নাম্বার দ্বারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সার্চ করে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করত। মানুষ যখন তার সাথে দেখা করত তখন সে তার ব্যক্তিগত অনেক তথ্যই আগে-ভাগে বলে দিতে পারত। তখন উক্ত ব্যক্তির মনে একটা ধারনা জন্ম নিত যে তিনি অনেক কিছু জানেন বা অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী।

যেহেতু অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয় রেডিও চ্যানেল এবিসি রেডিও ৮৯.২ এফ এম এ প্রচার করা হতো তাই অল্প সময়ের মধ্যেই এটি লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌছে যেত। তার এই অতীত, বর্তমান, ভবিষৎ বলে দেওয়াকে সহজ সরল মানুষ সত্য ভেবে তার ভক্ত হয়ে যেত আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়াসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা আদায় করত। মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্য আতর, মুক্তা, আংটি ইত্যাদি ব্যবহার করার জন্য দেওয়া হত বলে জানানো হয়।

সিয়াইডির বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, উক্ত মুক্তাগুলো স্বপ্নে পাওয়া বলে দাবি করে এবং এই সংক্রান্তে একটি গল্প এবিসি রেডিওতে ০৬ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে প্রচার করা হয়। মূলত এই রাদবি রেজাকে সব দিক থেকে সহায়তা করত এবিসি রেডিওর সাবেক আরজে কিবরিয়া। রাদবি রেজা ইউটিউব ও ফেসবুকে বিভিন্ন ম্যাজিক ট্রিক দেখিয়ে দাবি করত- সে হাত দিয়ে জ্বীন ধরতে পারে, ব্রেইন দিয়ে লাইট জ্বালাতে পারে, খালি হাতে মোম বাতি জ্বালাতে পারে ইত্যাদি। এগুলো দেখিয়ে মূলত সে নিজেকে অতিমানবীয় ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবি করত। সহজ সরল মানুষ তার কাছে ট্রিটমেন্ট নিতে আসলে তাদেরকে বিভিন্ন সমস্যা ও জীন ঘটিত ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা পয়সা দাবিসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দাবি করত।

এছাড়া, ফেসবুকে টেরোট কার্ড রিডিং করে মানুষের ভবিষৎ বলে দিত ‘ফেসবুক টেরট লাইভের’ নামে। সেখানে বিভিন্ন মানুষ তার কাছে ভবিষ্যৎ ও নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান জানতে কমেন্টস করত এবং লাইভে এসে কথা বলত। তখন সে তাদেরকে তার সাথে পার্সোনালী অফিসে এসে যেগাযোগ করতে বলত।

মূলত পার্সোনালী যোগাযোগের নামেই সে তাদেরকে তার বাসায় নিয়ে ট্রিটমেন্টের নামে অর্থ হাতিয়ে নিত। তাছাড়াও তার একটি ওয়েবসাইট আছে এবং একটি টেরট কার্ড কন্সালটেন্সি ফার্ম আছে যা কিনা সরকারী অনুমোদিত বলে সে দাবি করে। সেখানে তার সাথে দেখা করতে হলে সর্বোচ্চ ২ ঘন্টায় ২০,৪০০/- টাকা দিতে হয় বলে উল্লেখ আছে। যা বিকাশের মাধ্যমে অগ্রিম দিতে হয়।

ডর টেরট প্রোগ্রামের মাধ্যমে সে আরও দাবি করত যে, সে টেরট কার্ডের মাধ্যমে যে কাউকে লটারীতে জিতিয়ে দিতে পারেন, খেলার ফলাফল আগে জাকে বলে দিতে পারেন, পরীক্ষার ফলাফল আগে তাকে বলে দিতে পারেন, ক্যান্সার ও প্যারালাইসিসের রোগীকে ভাল করে ফেলতে পারেন, এমনকি কোমায় থাকা রোগীকেও সুস্থ করে তুলতে পারেন।

উল্লেখ্য, এই ডিজিটাল প্রতারক রাদবি রেজা ২০১২ সালের ১৪ জানুয়ারি শেরে বাংলা নগর থানা পুলিশ কর্তৃক ২০টি চোরাই মোটরসাইকেলসহ গ্রেফতার হয়েছিল। যার মামলা নং-১৯, তাং-১৪/০১/২০১২ ইং ধারাঃ ৪১৩/৩৪ পেনাল কোড-১৮৬০। বিষয়টি ১৫ জানুয়ারি ২০১২ তৎকালীন বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ (২) ধারার মামলাটি বর্তমানে সিআইডি কর্তৃক তদন্তাধীন আছে।