‘ট্যারট বাবা’ আসলে কী করতেন?

প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০১৮ / ০৯:৩৩পূর্বাহ্ণ
‘ট্যারট বাবা’ আসলে কী করতেন?

বেসরকারি রেডিও চ্যানেল এবিসির অনুষ্ঠান ‘ডর’-এর ‘ভৌতিক গবেষক’ হিসেবে পরিচয় দেন রাদবি রেজা ওরফে ‘ট্যারট বাবা।

ভিডিওটি দেখুন এখানে

২৮ ফেব্রুয়ারি, বুধবার রাতে রাদবিকে গ্রেফতার করেছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা। এই ট্যারট বাবা আসলে কী করতেন? রেডিওর শ্রোতা ও সাধারন মানুষের সাথে কিভাবে প্রতারণা করতেন? সিআইডির পক্ষ থেকে এসবের একটি বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তবে সব তথ্য প্রিয়.কম স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম দাবি করেন, এবিসি রেডিওতে ডর অনুষ্ঠানে শুধু ভৌতিক গল্প শোনানো হত। রাদবি রেজা সেখানে কথিত প্যারানরমাল রিসার্চার হিসাবে যুক্ত হন। আর যুক্ত হবার পর থেকেই শুরু হয় মানুষের নানারকম সমস্যার সমাধান পর্ব- ‘ট্যারট কার্ড সেগমেন্ট’।

বিশেষ পুলিশ সুপার আরও জানান, এই পর্বে কোনো মানুষকে অংশগ্রহন করতে হলে তাকে নির্দিষ্ট একটি নম্বরে ফোন করে নিজের পরিচয় দিতে হতো। ফলে খুব সহজেই বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে তাদের ফোন নাম্বার পেয়ে যেতেন ‘ট্যারট বাবা’। এর পর সংগৃহীত নাম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে সার্চ করে ফেসবুক আইডি খুঁজে বের করতেন। সেখান থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতেন। পরে ওই ব্যক্তি যখন তার সাথে (ট্যারট বাবা) দেখা করতেন, তখন তিনি তার ব্যক্তিগত অনেক তথ্যই আগে-ভাগেই বলে দিতে পারতেন। ফলে ওই ব্যক্তির মনে একটা ধারনা জন্ম নিত যে, ‘ট্যারট বাবা’ অনেক কিছু জানেন বা অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী।

যেভাবে হাজার হাজার মানুষ ভক্ত

বিশেষ পুলিশ সুপার জানান, অনুষ্ঠানটি যেহেতু জনপ্রিয় রেডিও চ্যানেলে প্রচার করা হতো, তাই অল্প সময়ের মধ্যেই এটি লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌছে যেত। আর সহজ সরল মানুষেরা ট্যারট বাবার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি তাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষৎ সম্পর্কে বেশ কিছু কথা বলতেন, যা শুনে অনেক মানুষই তা সত্য ভেবে তার ভক্ত হয়ে যেত। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়াসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা আদায় করতেন।

সিআইডির এই কর্মকর্কার ভাষ্যমতে, কোন মানুষ তার কাছে চিকিৎসা নিতে গেলে তাদেরকে ‘ট্যারট বাবা’ জানাতেন, তাদের জীন ও ভুতের সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানের নামে আতর, মুক্তা, আংটি ইত্যাদি ব্যবহার করার নামে মানুষের কাছে থেকে টাকা হাতিয়ে নিতেন। মুক্তাগুলো স্বপ্নে পাওয়া বলে দাবি করতেন তিনি।

স্বপ্নে পাওয়া মুক্তা সংক্রান্ত একটি গল্প এবিসি রেডিওতে ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল রাতে প্রচারিত হয়েছিল।

মোল্লা নজরুল ইসলাম জানান, রাদবি রেজা ইউটিউব ও ফেসবুকে বিভিন্ন ম্যাজিক ট্রিকের ভিডিও দেখাতেন। এসব দেখিয়ে দাবি করতেন, তিনি হাত দিয়ে জ্বিন ধরতে পারেন, ব্রেইন দিয়ে লাইট জ্বালাতে পারেন, খালি হাতে মোমবাতি জ্বালাতে পারেন, পরীক্ষার ফলাফল আগে থেকেই বলে দিতে পারেন, ক্যান্সার ও প্যারালাইসিসের রোগীকে ভাল করে ফেলতে পারেন, এমনকি কোমায় থাকা রোগীকেও সুস্থ করে তুলতে পারেন।

ফেসবুক লাইভ

রাদবি রেজা ‘ডর’ অনুষ্ঠানের ফেসবুক পেজ ছাড়াও ‘ফেসবুক ট্যারট লাইভ’ নামে একটি পেজ খুলেছিলেন। সেখানে তিনি লাইভে আসতেন। আর ফেসবুকে ট্যারট কার্ড পড়ে মানুষের ‘ভবিষ্যত’ বলে দিতেন। সেই লাইভ পেজে বিভিন্ন মানুষ তার কাছে ভবিষ্যত ও নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান জানতে কমেন্টস করত। অনেকে লাইভে এসে তার সাথে কথা বলত। তখন তিনি তাদের তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতে ববলতেন। এমন যোগাযোগের নামেই তিনি মানুষকে বাসায় নিয়ে চিকিৎসার নামে অর্থ হাতিয়ে নিতেন।

এছাড়াও তার একটি ওয়েবসাইট আছে এবং একটি ট্যারট কার্ড কন্সালটেন্সি ফার্ম আছে। সেখানে তার সাথে দেখা করতে হলে একজন ব্যক্তিকে ২ ঘণ্টার জন্য অগ্রিম ২০ হাজার ৪০০ টাকা দিতে হয়।

‘ট্যারট বাবা’র ওয়বসাইটও আছে।

আগেও গ্রেফতার

সিআইডির সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাদবি রেজা ২০১২ সালের ১৪ ই জানুয়ারি শেরে বাংলা নগর থানায় ২০টি চোরাই মোটরসাইকেলসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। এই সংক্রান্ত একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। মামলা নং-১৯, তারিখ- ১৪ জানুয়ারি ২০১২।

এখন যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা এক ভুক্তভোগীর মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলা নম্বর ৩৬, তারিখ ১২ ফেবরুয়ারি ২০১৮।

যা যা পাওয়া গেল

গ্রেফতারের সময় ট্যারট বাবার কাছে থেকে ট্যারট কার্ড, ১ টি জিপিএস জ্যামার, ২২ টি কথিত মুক্তা, ২৮ টি ধুপ, কথিত ইস্তাম্বুলের আতর ২ টি, ১ টি পড়া পানির বোতল, ৩ টি মোবাইল ফোনসেট, ২ টি সিপিউ ও লাইভের জন্য ব্যবহৃত ১ টি ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান মোল্লা নজরুল ইসলাম।